রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি অনেক সময় চরম ত্যাগ ও কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রামের এক পথ। সেই কঠিন পথের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি বাগেরহাটের চিতলমারীর রুনা গাজী। মাত্র ৩ মাসের শিশু সন্তানকে বুকে নিয়ে যিনি দিনের পর দিন অন্ধকার কারাগারে কাটিয়েছেন, জেলগেট থেকে বারবার হয়েছেন গ্রেফতার—সেই লড়াকু নেত্রী এবার শুধু বাগেরহাট নয়, সারা দেশের মানুষের কাছে পরিণত হয়েছেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে।
শত বাধা পেরিয়ে সম্প্রতি বাগেরহাট জেলার ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী ২০২৫’ পদকে ভূষিত হওয়া এই নেত্রীকে নিয়ে এখন গর্ব করছে পুরো দেশ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে তাকে দেখার জোর দাবি উঠেছে তৃণমূল থেকে।
২০১৪ সালে বিপুল জনপ্রিয়তায় চিতলমারী উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন উচ্চশিক্ষিত এই নারী নেত্রী। কিন্তু রাজনীতির বৈরী স্রোত তাকে রেহাই দেয়নি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২০১৫ সালে ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালীন মাত্র ৩ মাসের শিশু সন্তানসহ দীর্ঘ ৪ মাস কারাভোগ করেন তিনি। জেলগেট থেকে তাকে পর পর তিনবার গ্রেফতার করা হয়। চরম আক্রোশের শিকার হয়ে একদিনেই ৩টিসহ মোট ১৮টি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার আসামি হয়েছেন তিনি। তবুও ন্যায়ের পথ এবং রাজপথ—কোনোটিই ছাড়েননি। শুধু দলীয় আন্দোলনেই নয়, সাম্প্রতিক জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনেও ছিল তার সাহসী ও সক্রিয় উপস্থিতি।
ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বিএসএস (অনার্স) ও এমএসএস এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রিধারী রুনা গাজীর নেতৃত্বে হাতেখড়ি ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৯৮ সালে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি থেকে শুরু করে ইডেন কলেজের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং চিতলমারী উপজেলা মহিলা দলের আহ্বায়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যও রুনা গাজীর আদর্শিক দৃঢ়তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। তার পিতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাওসার আলী গাজী ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত। স্বামী অ্যাডভোকেট ফজলুল হক শেখও একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক, যিনি বর্তমানে চিতলমারী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তৃণমূলের মানুষের সুখ-দুঃখে এই পরিবারটি সবসময় ছায়ার মতো পাশে থেকেছে।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সংরক্ষিত আসনের বিষয়ে রুনা গাজী বলেন, “দলের চরম দুঃসময়েও যেমন মাঠ ছাড়িনি, তেমনি সাধারণ মানুষের সুখে-দুঙ্খেও সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। দল যদি আমার অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে আমাকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেয়, তবে আমার প্রথম লক্ষ্য হবে নারীদের স্বাবলম্বী করা। এলাকার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করব।”
সংবিধান অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনের নির্বাচন আগামী মে মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বাগেরহাটের তৃণমূল নেতাকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দ এখন রুনা গাজী। তাদের প্রত্যাশা, হামলা-মামলা ও কারাবাস উপেক্ষা করে যে ত্যাগী নেত্রী রাজনীতির মাঠে অবিচল থেকেছেন, তাকেই মূল্যায়ন করবে বিএনপির হাইকমান্ড।
বাগেরহাটের গণ্ডি পেরিয়ে রুনা গাজীর এই অদম্য লড়াইয়ের গল্প আজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনীতির চায়ের কাপে তিনি এখন প্রশংসিত এক নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, আদর্শের প্রতি অবিচল থাকলে শত বাধাও একজন লড়াকু নারীকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে, রাজপথের এই অগ্নিকন্যাকে সংসদে দেখার অপেক্ষায়।

Leave a Reply