আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল; ব্যক্তিবিশেষের দায়ে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনা করা হোক
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মগবাজারস্থ আদ-দ্বীন হাসপাতালে এক শিশুর চিকিৎসায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেকোনো চিকিৎসালয়ে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসায় প্রাণহানির ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া সময়ের দাবি।
তবে ব্যক্তিবিশেষের বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসকের গাফিলতির দায় চাপিয়ে একটি সুপরিচিত, জনকল্যাণমুখী ও দরিদ্রবান্ধব হাসপাতালের লাইসেন্স সম্পূর্ণ বাতিল করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক ও দূরদর্শী, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।আদ-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিম্নবিত্ত, দিনমজুর ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত চিকিৎসা, বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্য সেবার এক বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। করপোরেট চিকিৎসার যুগে যখন সাধারণ মানুষের পক্ষে হাসপাতালের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন আদ-দ্বীনের মতো অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের বড় ভরসা।
আকস্মিক ও চরম এই সিদ্ধান্তের ফলে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন শত শত অসহায় রোগী, বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU/NICU) থাকা শিশুরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সাথে বিঘ্নিত হচ্ছে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির অধিকার।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা সরকারকে এই ধরনের চরম পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন, তারা মাঠপর্যায়ের মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
চিকিৎসায় গাফিলতির জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা অবহেলাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাই ছিল আইনি ও যৌক্তিক প্রক্রিয়া। তা না করে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া মূলত মূল অপরাধীদের আড়াল করার সুযোগ তৈরি করে এবং সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ক্ষমতার বলয়ে থেকে অনেক সময় আমলারা জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেন, যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তায়।
অপরাধের শাস্তি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, তবে তা যেন কোনোভাবেই সাধারণ ও অসহায় মানুষের মৌলিক অধিকার তথা চিকিৎসা সেবা পাওয়ার পথকে অবরুদ্ধ না করে। চিকিৎসায় অবহেলার ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন কমিটি গঠন করা হোক এবং দোষীদের আইনানুগ শাস্তি দেওয়া হোক। একই সাথে, লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তটি জরুরি ভিত্তিতে পুনঃবিবেচনা করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। শর্তসাপেক্ষে বা নির্দিষ্ট নজরদারির মাধ্যমে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা এখন সময়ের দাবি।