গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ১৬ বছরের বকেয়া পাওনা ও অধিকার রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ

গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ১৬ বছরের আইনগত পাওনা পরিশোধ, অর্জিত অধিকার সংরক্ষণ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবিতে আজ ২৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ১১:০০টায় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, গ্রামীণফোনের শ্রমিকরা গত ১৬ বছর ধরে তাদের আইনসঙ্গতভাবে প্রাপ্য পাওনা থেকে বঞ্চিত। তাদের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২০৪ ও ২৫০ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় অনুযায়ী বিলম্বজনিত আইনগত পাওনার পরিমাণ বর্তমানে প্রত্যেকের প্রায় ৩৩.১৩৭ কোটি টাকা। বক্তারা জানান, দীর্ঘদিনের এই বিরোধের একটি শান্তিপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে তারা সংলাপের মাধ্যমে নিষ্পত্তির আশ্বাস জানিয়ে কর পরিশোধের পর মাত্র ১০ কোটি টাকা গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা কর রাজস্ব অর্জন করতে পারবে এবং একই সঙ্গে ১৬ বছরের একটি জটিল বিরোধের স্থায়ী অবসান সম্ভব হবে।

তবে সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, টানা ১৯ মাস ধরে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি, মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার, শ্রম অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।

সমাবেশে সাম্প্রতিক রিট পিটিশন নং ৮৪৬৪/২০২৬ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উক্ত রিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬, মোবাইল ফোন অপারেটরদের Industrial Undertaking-সংক্রান্ত বিধান এবং Workers’ Profit Participation Fund (WPPF) ও Workers’ Welfare Fund (WWF)-সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাদের আশঙ্কা, যদি এই রিটের ফলে শ্রমিকদের অর্জিত WPPF/WWF-সংক্রান্ত অধিকার, ৫% মুনাফাভিত্তিক অংশগ্রহণ অথবা বিলম্বজনিত আইনগত পাওনার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন বা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তবে এর প্রভাব কেবল গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমিকদের আইনগত অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের শ্রম আইন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়; বরং দেশের সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মুনাফায় অংশগ্রহণ এবং শিল্পক্ষেত্রে সুষম শ্রমসম্পর্ক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। ফলে শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কোনোভাবেই দুর্বল বা সীমিত হওয়া উচিত নয়।

সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয় যে, গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ৫% WPPF/WWF-সংক্রান্ত বিলম্বজনিত আইনগত পাওনার একটি ন্যায্য, আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গ্রামীণফোন লিমিটেডের বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের, বিশেষ করে বিদেশে মুনাফা বা লভ্যাংশ স্থানান্তরের বিষয়টি প্রচলিত আইন ও প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আলোকে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। বক্তাদের মতে, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের আইনগত দাবি অনিষ্পন্ন রেখে বিদেশে মুনাফা স্থানান্তরের বিষয়টি জনস্বার্থ, ন্যায়বিচার এবং শ্রম আইনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একই সাথে সমাবেশ থেকে দেশের সকল শিল্প ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী, বিশেষ করে WPPF ও WWF-এর আওতাভুক্ত সকল শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন ও শ্রম অধিকারকর্মীদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, শ্রমিকদের অর্জিত আইনগত অধিকার কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের অধিকার। তাই শ্রম আইন-সংক্রান্ত রিট পিটিশন নং ৮৪৬৪/২০২৬-এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সকল শ্রমিককে সচেতন থাকার এবং শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার সংরক্ষণের দাবিতে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

সর্বশেষে, সমাবেশ থেকে সরকার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি অবিলম্বে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে একটি ন্যায্যসম্মত, আইনসম্মত ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শিল্পক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানায় আয়োজক সংগঠন ‘গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’।


Posted

in

by

Tags:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *