September 22, 2026, 10:53 am
শিরোনাম :
গাজী নজরুলের বিষয়ে স্পিকারের চিঠির অপেক্ষায় ইসি সচিব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলার জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইলে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন কৃষক কুমিল্লা সীমান্তে ৭৪ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি আটক শিক্ষা ও প্রযুক্তি আদান-প্রদানের মাধ্যমেই বজায় থাকবে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব: শিক্ষামন্ত্রী বেকারত্ব দূর করতে কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী, ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য বিজিএফসিএলের অপ্রতিম হত্যার বিচার সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সিন্ডিকেটের কবলে পাঠ্য বই ছাপা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকে প্রায় ৯ কোটি ও মাধ্যমিকে প্রায় ২১ কোটি বই ছাপানো হবে। এজন্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এরমধ্যে মাধ্যমিকের বই ছাপাতে প্রায় ১ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা ও প্রাথমিকের জন্য প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। মঙ্গলবার চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে। আর আগামী ২৪শে জুলাই উন্মুক্ত হবে নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র।

৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পরও সিন্ডিকেটের কবলমুক্ত হয়নি পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজ। পুরনো সিন্ডিকেটের চারটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ১৪ কোটি টাকা কাজের ৩৫ শতাংশ হাতিয়ে নিয়েছে। বাকি কাজও বাগিয়ে নিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত কাজ নেয়ায় ডিসেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ভেঙে দিয়েছে মুদ্রণ সমিতি। সেইসঙ্গে ৩৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চেয়েছে দুুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগ অনুযায়ী এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক ডাক ও টেলিযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের ছোট ভাই আনন্দ প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী মো. রাব্বানি জব্বার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিওন জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজন অগ্রণী প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেল হোসেন। তারা দু’জন বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

অভিযোগে আরও বলা হয়, চলতি বছর পাঠ্য বই ছাপানোর কাজ করছে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান। তবে সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো কাজ ভাগ করে দিচ্ছেন রাব্বানি জব্বার ও কাউসার-উজ-জামান রুবেল। মূলত প্রেসগুলোর মেশিনের সংখ্যা হিসেবে কাজ ভাগ করে দেয়া হচ্ছে। আবার অনেক বন্ধ প্রেসের নাম দেখিয়েও নিজে কাজগুলো নিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে প্রতিটি টেন্ডারের ৩৫ শতাংশ কাজ ওই সিন্ডিকেট রেখে বাকিগুলো ভাগ করে দিচ্ছেন। এ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেই দেয়া হয় হুমকি। অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার কাজ প্রায় সোয়া ২০০ কোটি টাকার। এরমধ্যে কাউসার উজ-জামান রুবেলের অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস পেয়েছে ৩০ কোটি ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ২৩১ কোটির কাজ। আর রাব্বানি জব্বারের আনন্দ প্রিন্টার্স পেয়েছে ১০ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার ১৬৭ টাকার কাজ। এ ছাড়া দুলাল সরকারের মালিকানাধীন সরকার প্রেস, অন্যন্যা প্রিন্টার্স ও বলাকা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স পেয়েছে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬৩ হাজার ৩০২ কোটি টাকার কাজ। আর এস এম মহসীনের প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স পেয়েছে ১২ কোটি ১৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার কাজ। অন্যান্য প্রেসগুলো গড়ে দুই কোটি টাকার বেশি কাজ পায়নি।

সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ছোট ভাই রাব্বানি জব্বার ২০২১ সালে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতিরও চেয়ারম্যানের পদও অনেকটা জোর করে দখলে নিয়েছেন। গত ১৫ বছর এনসিটিবি’র বই ছাপায় একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ছিল তার।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার পিওন জাহাঙ্গীর আলমের ছত্রচ্ছায়ায় চলতেন কাউসার-উজ-জামান রুবেল। দীর্ঘদিন জাহাঙ্গীর এনসিটিবি’র কাজ নিয়ন্ত্রণ করতো। মুদ্রণ সমিতির গত নির্বাচনে জাহাঙ্গীর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে রুবেলকে সেক্রেটারি বানিয়েছে। সাবেক দুই শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও মহিবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গেও ছিল রুবেলের সখ্যতা। তিনিই মূলত রাব্বানি জব্বারের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের দু’জনের বিরুদ্ধেই নিম্নমানের বই ছাপার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে সদস্যদের দীর্ঘদিনের চাওয়া ও নানা আইনি তৎপরতার পর অবশেষে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গত রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে একজন উপসচিবকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হলেও এনসিটিবি’র আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজ তাদের হাতেই রয়ে গেছে।

মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত; সেহেতু, বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২ এর ১৭ ধারা মোতাবেক সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদ বাতিলপূর্বক সরকারের অনুমোদনক্রমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সন্দ্বীপ কুমার সরকারকে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হলো। তিনি ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ও দায়িত্ব হস্তান্তর করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন।

এদিকে চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্য বই ছাপায় ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এরই মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বহিষ্কৃত নেতা গাজী সালাউদ্দিন আহমেদ তানভীরসহ ৩৬ প্রেস মালিকের বিষয়ে এনসিটিবি’র কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেয়া হয়েছে।
এনসিটিবি’র একটি সূত্র বলছে, গত ২৪শে জুন এনসিটিবিকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিতে কারা বই ছাপায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত পাঠ্য বই ছাপিয়ে অর্থ আত্মসাত এবং শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির নামে ৩৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। তারা অনুসন্ধানের জন্য ছয় ধরনের তথ্য চেয়ে এনসিটিবিকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে দরপত্রের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, বই গ্রহণ, প্রিন্টার্সদের সঙ্গে চুক্তির পরও তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে কিনা এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, মুদ্রণকারীদের বিল পরিশোধ, আমদানিকৃত মুদ্রণ কাগজের পোর্ট ডেমারেজ, নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ এবং ৩৬টি প্রেস মালিকদের গত ১০ বছরের কাজের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এরই মধ্যে এনসিটিবি এসব তথ্য দুদকে পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, গত বছর ওনারা এনসিটিবি’র অফিসে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তারা নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এটার তথ্য সরকারের কাছেও গিয়েছে। আমরাও অভিযোগকারীদের সমর্থন করেছি। তারা ভুয়া ভোটার তালিকাও তৈরি করেছিল। সেটার অভিযোগ আমরা দেবো। নির্বাচনের সুন্দর পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা নির্বাচন দেবো। এই বিষয়ে মুদ্রণ সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি রাব্বানি জব্বারকে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে এনসিটিবি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, এ দুর্নীতিগুলো সূক্ষ্মভাবে হয়েছে। পূর্বের চেয়ারম্যানরা বলতে পারবেন এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে? আমি দায়িত্ব নেবার পর বিষয়গুলো জেনেছি। আমরা চাই, দুর্নীতিমুক্ত হোক পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ। আমরা দুদককে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি।