রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
গত ৫ই আগস্টের পর থেকে রাউজানে বেড়েছে একের পর এক চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি । প্রতি রাতেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও না কোথাও ঘটছে এসব ঘটনা। রাতে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল রাবার বাগান এলাকায় ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। দেখার যেন কেউ নেই। কারো গোয়ালের গরু নেই, নেই ঘরের আসবারপত্র ও স্বর্ণালঙ্কার। টাকা পয়সা যা পাচ্ছে তাই হাতিয়ে নিচ্ছে চোর-ডাকাতের চক্ররা। এই নিয়ে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ। জানা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মৌসুমি ব্যবসায়ীর আনা ট্রাক ভর্তি গরু ছিনতাই, কৃষকের গৃহপালিত গরু গোয়াল ঘর থেকে চুরি, মানুষের ঘরে ঢুকে লুটপাটসহ চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে প্রতিনিয়ত। গত দুই মাসে নোয়াজিষপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১০-১৫টি গরু, পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে ৪টি গরুচুরিসহ ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অন্তত ৫০টি গরু চুরি হয়েছে। ডাকাতির ঘটনাও ঘটে দু’একটি। গত ২২ মে বৃহস্পতিবার পাহাড়তলী ইউনিয়নের শেখপাড়ায় একটি বাড়ির সিঁড়ি ঘরের টিন কেটে বাড়িতে ঢুকে একদল ডাকাত স্বর্ণালংকারসহ ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ডাকাত কবলিত পরিবারের এক নারী সদস্য আয়শা বেগম বলেন, ডাকাত দল ঘরে প্রবেশ করে অস্ত্রের মুখে সকলকে জিম্মি করে ফেলে। তারা পরিবারের সদস্যদের শারীরিক নির্যাতন করে ঘরের আলমিরার চাবি আদায় করে। চাবি নিয়ে সব আসবাবপত্র খুলে, ভেঙে সবকিছু তছনছ করে দুটি ঘর থেকে ছয় ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ একলাখ চার হাজার টাকাসহ মূল্যবান জিনিষপত্র লুটে নেয়। ওই এলাকার একটি খামারে থাকা সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায় ডাকাতদল ডাকাতি শেষে দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ বাগোয়ান ইউনিয়নে কোয়েপাড়ার এলাকার দিকে চলে যাচ্ছে। পর দিন সকালে সংবাদ পেয়ে চুয়েট ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক মো. মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। ১৯ মে সোমবার দিবাগত রাতে নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সেলিম মেনশনের সামনে থেকে একটি পিকআপ (চট্টমেট্রো-ন-১১-৭৪৭৩) চুরি হয়। এবিষয়ে ভোক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. শওকত ওসমান বাদী হয়ে ২২ মে রাউজান থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি জানান, প্রতিদিনের মত তার ড্রাইভার সকাল ৮টায় গাড়ি নিয়ে বের হন এবং রাত ১০টার দিকে উল্লেখিত বাড়িতে রেখে চলে যান। গভীর রাতে চোরের দল বাড়ির গেইটের ভেতর থেকে কৌশলে গাড়িটি চুরি করে নিয়ে যান। গত ১৭মে রাতে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের রাউজান অংশে রাবার বাগান এলাকায় ট্রাক ভর্তি ৯ টি গরু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরে অভিযোগ পেয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূইঁয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ রাবার বাগানে অভিযান চালিয়ে ১৮ মে সকালে সাড়ে ৮টায় ট্রাকসহ সাড়ে ৬লাখ টাকা মূল্যের ৯টি গরু উদ্ধার করে, সঙ্গে ছিনতাইকারীদের ফেলে যাওয়া একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডাবুয়া কলমপতি বিল থেকে স্বপন মহাজনের একটি গরু চুরি হয়। ডাবুয়া কলমপতি মহাজন পাড়ার বাসিন্দা স্বপন মহাজন জানান, তিনি প্রতিদিনের মতো সকালে গরুকে গোয়াল ঘর থেকে বের করে পার্শ্ববর্তী কলমপতি স্কুলের উত্তর পাশে বিলে ঘাস খাওয়ার জন্য নিয়ে যান। বিকেলে গরু ঘরে ফেরাতে গিয়ে দেখে বিলে গরু নেই। আশপাশে ও বনের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও গরু না পেয়ে ঘটনাটি থানা পুলিশকে জানাই। উপজেলার নোয়াজিষপুর ইউনিয়নে মোজাম্মেল হক জানান, বিগত দুই মাসের ব্যবধানে একাধিক বাড়ি ও খামার থেকে গরু চুরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে চোরের দল জহুর কাজীর বাড়ির উসমানের বাড়ি থেকে ১টি, মাওলানা হোসনেজ্জামার বাড়ি থেকে ১টি, আবেদ মোস্তফার ১টি, একই বাড়ির জসিম উদ্দীন দুলালের ১টি, ঠাকুর চাঁদ চৌধুরীর বাড়ির মো. ফিরোজের খামার থেকে ৪টি, কামদর আলী চৌধুরীর বাড়ির আবু আহমদের ১টি, নুর উদ্দীনের ২টি, খোশাল চৌধুরী বাড়ির জমির সওদাগরের ৪টি ও বাকপ্রতিবন্ধী নুরুল আলমের ২টি গরু চুরি করে নিয়ে গেছে। ১৩ জানুয়ারি পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের কৃষক রফিক উদ্দিনের গোয়াল ঘর থেকে দেড় লাখ টাকা দামের ১টি গরু চুরি হয়। ১৩ এপ্রিল কদলপুর ইউনিয়নের আরফা খাতুন নামের এক বৃদ্ধার গোয়ালঘর থেকে ৩টি গাভী, ১টি ষাঁড়, বাচুরসহ ৫টি গরু চুরি হয়। ২৫ জানুয়ারি ভোররাতে একই ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ জামা চৌধুরী বাড়ির কৃষক মো.ইউনুসের গোয়াল থেকে ৫টি গরু চুরি হয়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪লাখ ৪০হাজার টাকা।
প্রতি রাতেই কোনো না কোনো কৃষক বা খামারির বাড়িতে হানা দিচ্ছে চোরের দল। ফলে চরম আতঙ্কে রয়েছেন তারা। কষ্টে পালিত গরু রক্ষায় অনেকে গোয়ালঘরেই কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। জানা যায়, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে রাউজান উপজেলার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কিছু লাভের আশায় ১০-২০টি গরু বিভিন্ন স্থান থেকে কিনে এনে অস্থায়ী গোয়াল ঘর তৈরি করে লালন পালন করে।অপরদিকে কৃষকেরা তাদের গৃহস্থলে ৪-৫টি গরু লালন পালন করে প্রস্তুত করেন কোরবানি ঈদে বিক্রি করার জন্য। এসব গরু পালন করে অনেকে সাবলম্বীও হয়েছেন। কিন্তু কোরবানি ঈদ সামনে রেখে উপজেলায় গরু চোরের উপদ্রব বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এইদিকে প্রতি রাতে রাউজান উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল অভিযান দেখা গেলেও কমছে না চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই। পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোরের সিন্ডিকেট।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া গরু চুরির বিষয়ে বলেন, রাউজানে যে সমস্ত এলাকায় গরু চুরির ঘটনা ঘটছে সেগুলো পাহাড়ী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনা। এখানের প্রায় গরু বাহিরে বাঁধা থাকে। কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকেনা। রাতের আঁধারে এসব গরু নিয়ে গেলে তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ডাকাতির বিষয়ে বলেন, আমরা ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রতি রাতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনার তদন্ত ও অপরাধীদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলমান। আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানান তিনি।