মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, চাঁদা দাবি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী ও লা পেসেতা ফ্যাশন অ্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক ফরহাদ বিল্লা রুবেল (৩৯)।
লিখিত অভিযোগে ফরহাদ বিল্লা রুবেল দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি-আমদানি ও তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ব্যবসার প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা ও বিদেশি অতিথিরা নিয়মিত তাঁর অফিস ও বাসায় আসেন। তাঁদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিদেশি পানীয় বা হুকা-সংশ্লিষ্ট সামগ্রী নিয়ে আসতেন। ব্যবহারের পর কিছু খালি বোতল ও অন্যান্য সামগ্রী তাঁর বাসায় থেকে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচয়ে ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি তাঁর অফিসে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে পরিদর্শক মাহবুব রহমান, সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ, উপপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপপরিদর্শক মোহাম্মদ আলী, তৃষ্ণা রাণী বিশ্বাস, রুবেল হোসেন, সাইফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান ও লুৎফর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফরহাদ বিল্লা রুবেলের ভাষ্য, কর্মকর্তারা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এলোমেলো করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে সেখানে পৌঁছান। এরপর কর্মকর্তাদের কাছে কারণ জানতে চাইলে তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, একপর্যায়ে তাঁর কাছে মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়। এ সময় কর্মকর্তাদের একজন রুবেল হোসেন উপপরিচালক মেহেদি হাসানের সঙ্গে তাঁর কথা বলিয়ে দেন। পরে দাবিকৃত অর্থ কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত অর্ধেক অর্থ পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
ফরহাদ বিল্লা রুবেলের অভিযোগ, তিনি অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে তাঁকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে বাকি অর্থ আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। রাত ১১টা ১০ মিনিটের দিকে উপপরিচালক মেহেদি হাসান এসে তাঁর ব্যাগে থাকা নগদ ২০ লাখ টাকা নিয়ে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরে তাঁকে বনানীর নর্থ এন্ড কফিশপের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আরও অর্থের ব্যবস্থা করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরে গুলশান ও হাতিরঝিল হয়ে একটি আবাসিক এলাকায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে গেন্ডারিয়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, পরদিন তাঁর বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) ধারার সারণির ২৪(খ) ও ২৯(খ) ধারায় মামলা করা হয়। মামলার নম্বর ১২(৪)২৬।
ফরহাদ বিল্লা রুবেলের ভাষ্য, মামলার এজাহারে তাঁকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। জব্দ তালিকায় থাকা স্বাক্ষরও তাঁর নয় বলে তিনি দাবি করেছেন। এ ছাড়া অভিযানের সময় বাসা থেকে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগে তিনি আরও বলেন, মামলার এজাহারে কর্মকর্তাদের অভিযানের সময় এবং তাঁর উপস্থিতির বিষয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা বাসার সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলছে না। তাঁর দাবি, এজাহারে উল্লেখিত সময়ের চেয়ে অনেক আগে কর্মকর্তারা বাসায় প্রবেশ করেন এবং অনেক পরে সেখান থেকে বের হন।
এ বিষয়ে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার উচিত দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মো. বশির আহমেদ বলেন, একটি অভিযোগ প্রধান কার্যালয়ে জমা হয়েছে। বিষয়টি এখনো বিস্তারিত জানা হয়নি। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।