আর্থিক লেনদেন বা পূর্ব পরিচয়—কোনোটাই নেই। এমনকি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা না পেয়ে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল থানা পুলিশ। অথচ আদালতে সেই একই অভিযোগে মামলা ঠুকতেই কোনো পূর্ব-তদন্ত ছাড়াই সরাসরি জারি হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা! আর আদালতের ওই পরোয়ানা জারির ঠিক পরদিনই ভুক্তভোগীর হোয়াটসঅ্যাপে মামলার কপি পাঠিয়ে দাবি করা হলো ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার চাঁদা। চাঁদা না দিলে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলায় ফাঁসানোর রোমহর্ষক হুমকিও দিয়েছে একটি চক্র।
সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর এই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী নুজহাত সারওয়াত তমা।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ভুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে কাজ করছে রাজধানীর একটি সংঘবদ্ধ ভিসা জালিয়াতি ও প্রতারক চক্র।
আদালতের নথি বলছে, গত ১২ জুলাই ঢাকার সিএমএম আদালতের ৯ নম্বর আদালতে একটি সি.আর. মামলা (নং-৫৮১/২০২৬) দায়ের করেন ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা সৈয়দা শিনিয়াত নূরী।
মামলায় লন্ডন প্রবাসী তমার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৫০ লাখ ৯২ হাজার ৭৬৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
জানা গেছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই মামলাটি এর আগে রাজধানীর হাতিরঝিল ও রমনা থানায় করার চেষ্টা করেছিল চক্রটি। কিন্তু প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় পুলিশ তা গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়ায় এবং ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট মনে হওয়ায় পুলিশ মামলাটি নেয়নি।
পরবর্তীতে আদালতে মামলা দায়ের করা হলে কোনো তদন্ত ছাড়াই সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
অথচ ভুক্তভোগী নুজহাত সারওয়াত তমা ২০২৪ সাল থেকেই যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি সাবেক যুগ্ম সচিব এবং কৃষক দলের সাবেক উপদেষ্টা ও আহ্বায়ক প্রয়াত ডক্টর মো. নূরুল ইসলামের মেয়ে এবং তার মা তেজগাঁও বয়েজ স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা। তমার দাবি, দেশে দায়ের করা এই কথিত ঘটনার সঙ্গে তার কোনোভাবেই সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ নেই।
হোয়াটসঅ্যাপে ব্ল্যাকমেইল ও হত্যার হুমকি
আদালতে মামলা দায়েরের পরদিন, ১৩ জুলাই একটি বাংলাদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর (০১৩৫৫৯৭২৩২৮) থেকে প্রবাসে থাকা তমার কাছে মামলার একটি কপি পাঠানো হয়।
গণমাধ্যমের হাতে আসা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, সেখানে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়েছে—টাকা না দিলে বাংলাদেশে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হবে।
এমনকি তাকে হত্যা মামলার আসামি করারও হুমকি দেওয়া হয়।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, হুমকিদাতা ওই নম্বরটি হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার শেখ শামসুল হকের ছেলে শেখ এমদাদুল হকের। এ ঘটনায় নিজেদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে জিডি (সাধারণ ডায়েরি) দায়েরসহ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নেপথ্যে ‘গ্লোবাল ইমিগ্রেশন’-এর প্রতারক পরিবার
মামলার বাদী শিনিয়াত নূরী ও তার পরিবারের ব্যাপারে খোঁজ নিতেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সৈয়দা শিনিয়াত নূরী, তার স্বামী মহিউদ্দীন আহমেদ, মা তোলাত জিলানী, ছোট বোন সৈয়দা সেরা মাহজাবিন এবং বোন জামাই নাহিয়ান মাহমুদ—এই পুরো পরিবারটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র হিসেবে কাজ করছে।
তারা ‘গ্লোবাল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ভিসা কনসালটেন্সি’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ভিসা দালালি ও প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত। মূল হোতা মো. সোহেল রানা প্রতিষ্ঠানের আসল মালিক হলেও, আইনি জটিলতা এড়াতে কৌশলে তাকে এই মামলা থেকে আড়ালে রাখা হয়েছে।
চক্রটির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বাদীর ছোট বোন সৈয়দা সেরা মাহজাবিন যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘Community Careline Services Medway Limited’-এ কর্মরত অবস্থায় অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার দায়ে গত ৩ অক্টোবর (২০২৫) চাকরিচ্যুত হন। কালবেলার হাতে আসা যুক্তরাজ্যের ওই কোম্পানির বরখাস্তের চিঠির কপিতেও তার প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
মামলার সাক্ষীদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি পুরোপুরি একটি সাজানো নাটক।
মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তারা হলেন— রাজশাহীর প্রীতি ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের রিফাত হোসাইন, ভোলার মিজানুর রহমান, মানিকগঞ্জের মিলন মিয়া, মৌলভীবাজারের রাজন দাস, চট্টগ্রামের মায়মুনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবিনা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এরা কেউই সাধারণ বা নিরপেক্ষ সাক্ষী নন; তারা সবাই ওই অভিযুক্ত ভিসা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি ও দালাল হিসেবে কাজ করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, সাধারণত এ ধরনের বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের সি.আর. মামলায় আদালত প্রথমেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পিবিআই বা পুলিশের কোনো সংস্থাকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো তদন্ত ছাড়াই সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি বেশ অস্বাভাবিক এবং এখানে আইনি ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ভুক্তভোগী নুজহাত সারওয়াত তমা কালবেলাকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি কোনো ভিসা কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিলেন না। চাঁদা আদায়ে ব্ল্যাকমেইল করতেই তাকে এই ভুয়া মামলায় জড়ানো হয়েছে। অবিলম্বে সাজানো মামলাটি খারিজসহ তিনি সংঘবদ্ধ এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী সৈয়দা শিনিয়াত নূরী, হুমকিদাতা শেখ এমদাদুল হক এবং ভিসা প্রতিষ্ঠানের মূল মালিক মো. সোহেল রানার বক্তব্য জানতে তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরগুলোতে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

Leave a Reply