গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়ার প্রচলন নতুন নয়। একটা সময় যখন চিকিৎসাসেবা এতটা সহজলভ্য ছিল না, তখনও কিন্তু গর্ভবতী নারীদের খেজুর খাওয়ার অভ্যাস ছিল। আসুন জেনে নিন গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়ার উপকারিতা। গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়ার বড় কারণ হলো, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত খেজুর খেলে লেবার পেইন অনেকটা কম হয়। এটি মনগড়া কোনো কথা নয়, বরং অনেকগুলো গবেষণা শেষে এমন তথ্যই জানিয়েছেন গবেষকরা। গর্ভাবস্থায় খেজুর খেলে তা ইউটেরাসের সংবেদনশীলতা কমিয়ে তাকে শক্তিশালী করে। এতে প্রসব ব্যথা অনেকটাই কম হয়। আমাদের দেশে বেশির ভাগ নারীরা গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়ার উপকারিতার কথা জানা না থাকার কারনে এর সুফল ভোগ করতে পারে না।
গবেষণা কী বলছে
আমেরিকার ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থার পয়ত্রিশ সপ্তাহ পর থেকে প্রতিদিন ছয়টি করে খেজুর খেলে তা মা ও অনাগত শিশুর জন্য বেশ উপকারী হয়। সেইসঙ্গে সন্তান জন্ম দেওয়াও অনেকটা সহজ হয়ে যায়। গবেষণায় তারা দেখেছেন, যেসব নারী গর্ভাবস্থায় খেজুর খেয়েছেন তাদের সার্ভিক্স অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল ছিল, যে কারণে সন্তান প্রসব করা অনেক সহজ ছিল। খেজুর খেলে তা লেবারের সময়ও কমিয়ে দেয়, ফলে মাকে কষ্ট কম পেতে হয়।
বাড়তি শক্তি যোগ করে
সন্তান প্রসবের আগে এবং প্রসবের সময় একজন নারীর অনেক বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পড়ে অতিরিক্ত শক্তির। খেজুরে থাকে অনেক বেশি নিউট্রিয়েন্টস। যে কারণে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত খেজুর খেলে গর্ভবতী মায়ের শরীরে বাড়ে শক্তির মাত্রা। সেজন্য প্রসবের সময় বাড়তি শক্তির যোগান সে সহজেই দিতে পারে।
কার্বোহাইড্রেটস
খেজুরে থাকে প্রচুর কার্বোহাইড্রেটস। এছাড়াও থাকে ফ্রুক্টোজ এবং সুক্রোজ, যা শরীরে শক্তি যোগায়। এছাড়া এই ফলে গ্লুকোজও থাকে পর্যাপ্ত, যা গর্ভাবস্থায় ধরে রাখা খুব বেশি জরুরি। তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত খেজুর খাওয়ার বিকল্প নেই।
প্রসবপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক করে
গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এসে প্রতিদিন ৬০-৮০ গ্রাম খেজুর খেলে সার্ভিক্স মজবুত হয়। এর ফলে কৃত্রিমভাবে কিংবা ওষুধ দিয়ে প্রসব ব্যথা সৃষ্টি করার দরকার হয় না। এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ঘটে থাকে।
দ্রুত রক্ত উৎপাদন করে
সন্তান প্রসবের সময় শরীর থেকে অনেক রক্ত বের হয়ে যায়। এর ফলে মায়ের শরীর দুর্বল হয়ে যায়। গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের পরে নিয়ম করে খেজুর খেলে তা শরীরে দ্রুত রক্ত উৎপাদন করে। এতে মা তার হারানো শক্তি বেশ দ্রুত ফিরে পান।
কমায় প্রসব বেদনা
খেজুরে থাকে উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড। এই উপাদান প্রসবের সময়ে সারভাইক্যাল মাসল ফেলিক্সিবল করে ও কমনীয় করে তোলে, যে কারণে প্রসব বেদনা অনেকটাই কম অনুভূত হয়।
প্রসবব্যথা বা প্রসবের লক্ষণগুলো কি কি?
৩৬ বা ৩৭ সপ্তাহ গর্ভকাল পার হওয়ার পর প্রসবের জন্য একধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলা ভালো। এই প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় উৎকণ্ঠা হলো, অন্তঃসত্ত্বা মা কীভাবে বুঝবেন যে তাঁর প্রসবের সময় হয়েছে? এ সময় তলপেটে একটু-আধটু ব্যথা, জরায়ুর সংকোচন হতেই পারে, কিন্তু প্রসবব্যথা বা প্রসবের লক্ষণগুলো মা সচেতন হলেই কেবল টের পাবেন। নয়তো হাসপাতালে যেতে দেরি হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ঘটে যেতে পারে নানা বিপত্তি। স্বাভাবিক প্রসবের লক্ষণগুলো কী কী।
* তলপেটের ব্যথা ও জরায়ুর সংকোচন অনুভব করা
* রক্তমিশ্রিত স্রাব নিঃসরণ
* জরায়ুর মুখ খুলে যাওয়া
* পানিপূর্ণ থলে তৈরি হওয়া
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে, বিশেষ করে ১-২ সপ্তাহ আগে থেকে ফলস লেবার পেইন হতে পারে। এটা আসল প্রসবব্যথা নয়। গর্ভধারণের ১৬ সপ্তাহ পর জরায়ুর সংকোচন হয়, যাকে বলে ব্রেক্সটন হিক্স কনট্রাকশন। তবে এর সঙ্গে ব্যথা থাকে না। সত্যিকারের প্রসবব্যথার কিছু উপসর্গ আছে। নিয়মিত বিরতিতে ব্যথা শুরু হবে, এর সঙ্গে জরায়ু সংকুচিত হয়, অর্থাৎ পেট শক্ত হয়ে আসবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই বাড়তে থাকবে। ব্যথা যাওয়া-আসা করবে। কিন্তু মধ্যের বিরতি ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকবে। ব্যথাটা শুরু হয় পেছন দিক থেকে, তারপর ঊরু হয়ে সামনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথানাশক বা ঘুমের ওষুধ—কোনো কিছুতেই ব্যথার উপশম হয় না।
ফলস লেবার পেইন বা মিথ্যা প্রসবে ব্যথার তীব্রতা কম, কেবল তলপেট ও কুঁচকিতেই সীমাবদ্ধ, জরায়ু সংকোচন বা পেট শক্ত হয় না এবং ওষুধে কমে।
গর্ভের শিশুকে বাইরের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য জরায়ুর মুখ মিউকাস বা শ্লেষ্মাজাতীয় পদার্থ দিয়ে বন্ধ থাকে। প্রসবের সময় এলে এই মুখ খুলে যায়, পানি ভেঙে যায় ও রক্তমিশ্রিত স্রাব নিঃসৃত হয়। এটি প্রসব শুরু হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। যা-ই হোক, ওপরের লক্ষণগুলো মিলে গেলে দেরি না করে প্রসূতিকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত। কেননা, প্রসবের প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার পর যেকোনো মুহূর্তে শিশুর জন্ম হতে পারে।
ডা. শামীমা ইয়াসমিন : স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ, বিএসএমএমইউ