September 18, 2026, 12:02 pm
শিরোনাম :
নবীনদের স্বপ্নবুনন: ইসমাইলের উপস্থাপনায় আসছে ‘তারুণ্যের বাংলাদেশ’ সাবেক ছাত্রনেতা মানব মজুমদার সন্তোষপুর ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর আলোচনায়- জনসংযোগ শুরু বাগেরহাটের চিতলমারিতে পুলিশের অভিযানে নারীসহ ৬ সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার শ্রেণিকক্ষ সংকটে বটতলায় ক্লাস, সংবাদ প্রকাশের পর বিদ্যালয় পরিদর্শনে শিক্ষা কর্মকর্তা মানব কল্যাণে চিতলমারির ওয়ালটন পরিবার লিডস করপোরেশন ও বশির সিন্ডিকেটের হাজারকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ! পর্দার আড়ালে পরিবার ও রাজনীতির গল্প: সম্পন্ন হলো তারকাবহুল ‘বেগম পাড়া’র প্রথম লটের শুটিং জনদুর্ভোগ ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট: জেএসডি প্রেমের জোয়ার, কিন্তু বিয়ের কথায় ভয়! এই সমীকরণের উত্তর খুঁজছে ‘বউ ঘরের লক্ষী’ চিতলমারীর ২নং ওয়ার্ডে মেম্বার পদে পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে সেলিম খান

একটা পে-স্কেল হাজারো সমস্যার সমাধান

মতামত ডেস্ক;
-শুভ্র মানিক

খোলা মতামত :

টানা ১৫ বছর একটা অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলো। দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যক্তি ক্ষমতায় থাকার ফলে ইতিহাসের অমোঘ সত্য প্রমাণ করে সেই প্রাচীন রাজনৈতিক দলের সরকারও একনায়কতন্ত্র সরকারে পরিনত হয়। স্বভাবতই তাকে পরিনতি ভোগ করতে হয়। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৭১ সাল থেকে অদ্যাবধি যে সকল ব্যক্তি সরকার প্রধান হিসাবে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন তারা সকলেই ট্রাজিক হিরোর মতো করুন পরিনতি বরণ করে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

ছাত্র জনতার অভ্যূত্থানের ফলে সরকার প্রধানের দেশ ত্যাগ, সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের পলায়ন এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদ বিলুপ্ত করা হলে ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। স্বাভাবিক কারণেই দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা নৈরাজ্য এবং বৈষম্যের শিকার সকল শ্রেনী পেশার মানুষ সাময়িক পুলকিত হয়। তাদের দীর্ঘ দিনের চাহিদা উপস্থাপন করার স্বাধীনতা পায়। সেকারনে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের সাথে সাথেই বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের বৈষম্যের বিবরণ সরকারের কাছে তুলে ধরেন।

বিষয়টি অন্তবর্তীকালীন সরকারের জন্য একটা বিশাল চাপ তৈরী করে। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে প্রথম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে এযাবত ৮টি পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি ৫ বছর পর পর পে-স্কেল ঘোষণার কথা থাকলে রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে তৃতীয় ও ষষ্ঠ পে-স্কেল ঘোষণায় সর্বাধিক ৮ বছর সময় নেয়া হয়েছে। কিন্তু, ২০১৫ সালের পরে ৯ বছর অতিবাহিত হলেও স্থায়ী পে কমিশন গঠন কিংবা পূর্বের ধারাবাহিকতা অনুসারে ৫ বছর পর পর পে স্কেল ঘোষণা করা হয়নি।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয়টি বিগত সরকারের শাসনামলে অধিক চর্চা করা হয়েছে তা হচ্ছে পদ না থাকলেও সুপার নিউমারি পদ তৈরী করে লাগমহীন পদোন্নতি প্রদান। সরকার এগুলো করেছেন শুধুমাত্র উচ্চপদে বিশেষ করে ক্যাডার পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য। ফলে সরকারের পক্ষে একটি অনুগত দলীয় প্রশাসন তৈরী করতে বেশি বেগ পেতে হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর তথ্যমতে, ২০১৭ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮.৪৪ শতাংশ ও পণ্যমূল্য ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৭.১৭ শতাংশ। অনুরূপভাবে ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ শতাংশ এবং পণ্যমূল্য ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫.১৯ শতাংশ। প্রায় কাছাকাছি ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে ২০১৯ সালে, ৬.৫০ শতাংশ ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২১ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৬.৯২ শতাংশ এবং ২০২২ সালে বেড়েছে ১০.০৮ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার হার ৩.১৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশে; যা গত ১২ বছরের মধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সর্বোচ্চ রেকর্ড।

নিত্যপণ্যের সাথে সাথে বেড়েছে শিক্ষা, চিকিৎসা, মোবাইল খরচ, বাসা ভাড়াসহ প্রায় সবকিছুর। পিঁয়াজ, মসলাসহ অন্যান্য পণ্যের দাম তো কখনও মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। এর সাথে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি হয়েছে; গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে কয়েক দফা। কোনো কিছুই যেন আমাদের নাগালের মধ্যে নেই। যদি বিগত ৫-৬ বছরের কথা বিবেচনা করা যায়, তাহলে দেখা যাচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৫০%। এর সাথে বাড়ছে অন্যান্য সেবার মূল্য। কিন্তু ঐ একই সময়ে বেতন বেড়েছে ২০-২৫%। কিন্তু, প্রশাসনে একটা গ্রুপ পদ না থাকা স্বত্বেও পদোন্নতি পাওয়ায় তাদের আয় ব্যয়ের সামঞ্জস্য থাকলেও একটা বিশাল অংশ এখনো বঞ্চিত।

দিনে দিনে দেশের বাজেট বড় হচ্ছে কাজের পরিধি বাড়ছে সংগত কারণেই সকল দপ্তর পুনর্গঠন করে পদ সৃজন করা সমীচীন ছিলো। কিন্তু, পদ সৃজন না করে শুধুমাত্র ক্যাডার পদে সুপারনিউমারি পদোন্নতি প্রদান করে একটা মাথা মোটা প্রশাসন তৈরী করা হয়েছে। অপর দিকে নিম্নপদে যারা বছরের পর বছর চাকরী করছেন তাদের পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে একপ্রকার উন্নাসিকতা দেখানো হয়েছে। সকল দপ্তরের কাজের পরিধি অনুসারে নতুন নতুন পদ সৃজন করা হলে সকল স্তরে একটা ভারসাম্য বজায় থাকতো। পদোন্নতি না হওয়া, বেতন বৃদ্ধির হার দ্রব্যমূলে ঊর্ধ্বগতির সাথে সামঞ্জস্য না হওয়া, যথা সময়ে পদোন্নতি না হওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একটা স্বৈরাচারী মনোভাব সকল সরকারি দপ্তরে ১০ থেকে ২০ তম গ্রেডের কর্মচারীদের সাথে শুধু বৈষম্য নয় এক প্রকার মানবিক অত্যাচার হিসাবে অবির্ভুত হয়েছে। যার ফলে এসকল গ্রেডের কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা এবং সৃজনশীলতার বিকাশের পরিবর্তে নিজেকে টিকিয়ে রাখার বা নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার প্রচেষ্টায় বেশি মনোযোগী করেছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও ২০২৪ এর ছাত্র জনতার গণ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য একটা শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও যদি আমরা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হই তবে কবে আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা পাবো? প্রকৃতির ইচ্ছায় আমরা যে সুযোগ পেয়েছি তার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি বৈষম্যহীন, শোষনমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ সকলের কাম্য।

প্রশ্ন হচ্ছে এ থেকে উত্তরণের উপায় কি?

অনেকে নানা ভাবে বিষয়টি চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু, মূল বিষয় হচ্ছে এই দুর্বল ভিতের জনবল কাঠামোকে দ্রুত সংশোধন করে দ্রুততম সময়ে প্রতিটি দপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরী করে সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন করতে হবে। এতে করে প্রতিটি দপ্তরে পদোন্নতি বঞ্চিত নিম্নপদের অনেক কর্মচারী তাদের কাঙ্খিত পদোন্নতি পাবেন এবং একটা ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসন তৈরী হবে। প্রতি ৫ বছরে কমপক্ষে একবার পে-স্কেল ঘোষনার পাশাপাশি প্রতিটি দপ্তর / সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কার করার একটা বিধান চালু করা যেতে পারে। এছাড়া, বিদ্যমান দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ৯ম পে-স্কেল ঘোষণা হতে পারে এই সমস্যার প্রাথমিক সহজতর সমাধান। বিদ্যমান পে-স্কেলে ১ম গ্রেড হতে ২০ তম গ্রেডের বেতন পার্থক্য হচ্ছে প্রায় দশ গুন। এই ব্যবধানকে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেড সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বিদ্যমান ২০টি বেতন গ্রেডকে কমিয়ে ১০ থেকে ১২ টি যৌক্তিক গ্রেডে নির্ধাণ করা যেতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন গ্রেডে চাকরী করলেও কর্মস্থলে ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডের বেশিরভাগ কর্মচারীদের প্রায় একই কাজ করতে হয়। নিয়োগ যোগ্যতাও প্রায় ক্ষেত্রে একই।

মূল বিষয় হচ্ছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট জনবল কাঠামো থাকে। এই জনবল কাঠামোগুলোর মধ্যে পিরামিড আকৃতির জনবল কাঠামো বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর মর্মে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু, সরকারি দপ্তরে বিদ্যমান মাথা মোটা জনবল, প্রতিষ্ঠানের ভিত দূর্বল করে দিচ্ছে। তাই, দ্রুত মাথা মোটা জনবল সংস্কার করে পিরামিড আকৃতির জনবল কাঠামো তৈরী করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে যথা সময়ে পদোন্নতি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করে দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল ঘোষণার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুসারে নতুন পদ সৃজন করে একটা পরিকল্পিত জনবল কাঠামো গঠনই হতে পারে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য আন্দোলনের বিপরীতে একমাত্র সমাধান। নতুবা নির্দিষ্ট কোন একটি গ্রুপের দাবী-দাওয়া মেনে নেয়া হলে অপর একটি গ্রুপ তাদের দাবী নিয়ে মাঠে আসবে। আবার যৌক্তিক দাবী অগ্রাহ্য করলে প্রশাসনের শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে।

-শুভ্র মানিক